বালুরঘাট, ৪ মার্চ — দক্ষিণ দিনাজপুরের মাটির নীচে যে ইতিহাস স্তরে স্তরে ঘুমিয়ে আছে, তার আর এক বিস্ময়কর ইঙ্গিত মিলল বালুরঘাটের নাজিরপুর গ্রাম পঞ্চায়েতের কিসমত যশাহারে। প্রায় নয় বিঘা জায়গাজুড়ে বিস্তৃত বহু প্রাচীন ‘দালানপুকুর’-এর জল পাম্পে নামাতেই পুকুরের বুক চিরে দেখা দিল চওড়া ইটের তৈরি প্রাচীন সিঁড়ি। মুহূর্তে ছড়িয়ে পড়ে চাঞ্চল্য—গ্রাম যেন ফিরে তাকাল তার অজানা অতীতে।
স্থানীয়দের দাবি, প্রবল খরার সময়েও এই পুকুরের জল কখনও সম্পূর্ণ শুকোয়নি। তাই পাড় বাঁধানোর জন্য জল সরানোর সিদ্ধান্তেই যেন খুলে গেল রহস্যের দরজা। কাদামাটির তলা থেকে উঁকি দেওয়া চওড়া সিঁড়ির গঠন, ব্যবহৃত পুরনো ইটের মাপ ও বিন্যাস—সবই ইঙ্গিত দিচ্ছে সুপরিকল্পিত প্রাচীন স্থাপত্যের দিকে। পুকুরপাড় থেকে সোজা মাঝ বরাবর নেমে যাওয়া এই সিঁড়ি ঘিরে প্রশ্ন উঠছে—এ কি কেবল স্নানঘাট, না কি কোনও বৃহৎ ধর্মীয় স্থাপনার অংশ?
গ্রামবাসীদের বিশ্বাস, পুকুরপাড়ের গলাকাটা প্রাচীন কালীমূর্তির সঙ্গে এই জলাশয়ের নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। বহু প্রজন্ম ধরে চলে আসা অলৌকিক ঘটনার কথাও শোনা যায় এলাকায়। সেই বিশ্বাসে ভর করেই অনেকে মনে করছেন, পুকুরের তলায় হয়তো লুকিয়ে রয়েছে কোনও প্রাচীন মন্দির বা পূজাস্থলের ধ্বংসাবশেষ।
স্থানীয় বাসিন্দা গোবিন্দ পাল ও দীপা বিশ্বকর্মারা জানান, এত চওড়া সিঁড়ি কোনও সাধারণ পুকুরের হতে পারে না। মনে হচ্ছে মাঝখানে আরও বড় কিছু কাঠামো রয়েছে। তাঁদের অনুমান, পুকুরের কেন্দ্রে হয়তো একটি কুয়ো বা মূল স্থাপত্যের অংশ চাপা পড়ে আছে। প্রশাসনের হস্তক্ষেপে বৈজ্ঞানিক খননের দাবি তুলেছেন তাঁরা। যার মাধ্যমে বদলাতে পারে এলাকার ভৌগোলিক অবস্থানও।
পুকুর মালিক বাপী মাহাত বলেন, পুকুর পাড়ে প্রাচীন সেই কালী মূর্তি অত্যন্ত জাগ্রত। আগে পুকুরে সেভাবে কেউ নামবার সাহস না দেখালেও বর্তমানে সে অবস্থা কিছুটা বদলেছে। পুকুরটির পাড় বাধানোর জন্য জল বের করা হয়েছে। যেখানেই সামনে এসেছে সেই প্রাচীন সিড়ি, যা আগে তারা কখনও দেখেননি। তিনিও মনে করেন, প্রাচীন ইতিহাসের সঙ্গে পুকুরটির যোগ থাকা অস্বাভাবিক নয়।
ইতিহাসবিদ সমিত ঘোষের মতে, দিনাজপুর অঞ্চল বরাবরই পুরাতাত্ত্বিক সম্পদে ভরপুর। টেরাকোটার মন্দির, প্রাচীন ইটের গাঁথুনি, মূর্তি—প্রায়ই মিলেছে এই জেলায়। ঐতিহাসিক সূত্র বলছে, নাজিরপুর-যশাহার-কামালপুর অঞ্চল একসময় বৌদ্ধবিহার সমৃদ্ধ ছিল। ফলে এটি বৌদ্ধ স্থাপত্যের অংশ, না কি কোনও রাজবংশীয় মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ—তা নির্ধারণ করতে পারে একমাত্র পদ্ধতিগত খনন।
এখন সব চোখ প্রশাসনের দিকে। পশ্চিমবঙ্গ হেরিটেজ কমিশন কিংবা ভারতীয় পুরাতত্ত্ব বিভাগের উদ্যোগে যদি খনন শুরু হয়, তবে হয়তো উঠে আসবে কয়েকশো বছরের অজানা ইতিহাস। দালানপুকুর কি কেবল জলধারা, না কি ইতিহাসের স্তব্ধ দলিল—তার উত্তর লুকিয়ে আছে সেই মাটির তলাতেই

