জলপাইগুড়ি:————-—–
সম্পত্তির লোভে ডাকাতি করতে গিয়ে মামা’কে খুন। অভিযুক্ত ভাগ্নেকে ফাঁসির সাজা শোনালো জলপাইগুড়ি আদালত। সোমবার জলপাইগুড়ি অতিরিক্ত জেলা এবং দায়রা আদালত চতুর্থ কোর্টের বিচারক এই সাজা শোনান। পাশাপাশি, মৃত ব্যক্তির দুই নাবালক ছেলের ভরণপোষণের জন্য ক্ষতিপূরণ হিসেবে ছয় লক্ষ টাকা দেওয়ার জন্য ডিস্ট্রিক্ট লিগাল সার্ভিস অথরিটিকে নির্দেশ দিয়েছেন বিচারক।
সাজাপ্রাপ্ত’র নাম আফতাব আলম। বয়েস সাড়ে উনিশ,সবে দাঁড়িগোঁফ গজানো আরম্ভ হয়েছে। সদ্য যৌবনপ্রাপ্ত এই যুবক ঝুলতে চলেছে ফাঁসির দঁড়িতে। কিন্তু কেন? এই সামাব্য বয়েসে সে কি এমন করেছিলো যে বিচারক তাকে সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ড দিতে বাধ্য হলেন? যে কোনো ওটিটির থ্রিলার সিরিজকেও হার মানিয়ে দিতে পারে এই রোমহষর্ক ঘটনা।অভিযুক্ত এই আফতাব আলম ছোটবেলায় জলপাইগুড়ির আংরাভাষা গ্রামে মামা মেহতাব আলমের কাছেই থাকতেন। কিছুটা বড় হবার পর নিজের পরিবারের কাছে ফিরে যায় সে। কয়েকবছর পর সে ফিরে আসে মামাবাড়িতে, একবারেই অন্য চেহারায়, চুপিসারে রাতের অন্ধকারে। উদ্দেশ্য আর্থিকভাবে স্বচ্ছল মামারবাড়িতে ডাকাতি করে টাকাপয়সা,সোনাদানা লুঠ করা। দিনটা ছিলো ২০২৩সালের ২৭জুলাই। ডাকাতির পরিকল্পনা সফল করতে দিল্লি থেকে আরও পাঁচজনকে ভাড়া করে সঙ্গে নিয়ে এসেছিলো আফতাব। যাদের মধ্যে দুইজন তরুনীও ছিলো। দিনের বেলায় স্থানীয় একটি হোটেলে ছিলো তারা। ওইদিন গভীর রাতে পরিকল্পনা মাফিক আফতাব এবং তার সঙ্গীরা মিলে হামলা চালায় মামাবাড়িতে। প্রথমেই বাড়িতে ঢুকে ঘুমন্ত অবস্থায় থাকা মামা মেহতাবের ওপর এলোপাথাড়ি আক্রমণ করে আফতাব ও তার সঙ্গীরা। বাধা দিতে গেলে মামি মৌমিতা দাসের ওপরও ধারালো অস্ত্র নিয়ে হামলা চালায় তারা। দম্পতির দুই নাবালক ছেলে প্রাণে বাচতে বাড়ি ছেড়ে জঙ্গলে আশ্রয় নেয়। এরপর লুঠপাট চালিয়ে পালিয়ে যায় সকলে। এদিকে ভোর হয়ে এলে জঙ্গলে আশ্রয় নেওয়া দুই নাবালক সন্তান গ্রামে এসে প্রতিবেশীদের ঘটনা জানায়। প্রতিবেশীরা এসে গুরুতর জখম মেহতাব আলম এবং মৌমিতাদেবীকে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে পাঠায়। জানা যায় মেহতাব আলমের মৃত্যু হয়েছে। খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে আসে ধুপগুড়ি থানার পুলিশ। ইতিমধ্যে গ্রামের রাস্তায় রক্তমাখা কয়েকজনকে দেখতে পায় স্থানীয় যুবক রাজু ইসলাম। সে এবং আরও কয়েকজন মিলে তাদের আটকে রাখে এবং ধুপগুড়ি থানায় খবর দেয়। জানা যায় আটকরাই খুনী আফতাব এবং তার সঙ্গী। এরপরই পুলিশ তাদের গ্রেফতার করে। আদালতে মামলা শুরু হয়। তাদের মধ্যে মূল অভিযুক্ত আফতাবের মামলা ওঠে জলপাইগুড়ি অতিরিক্ত জেলা এবং দায়রা আদালত চতুর্থ কোর্টে। ধুপগুড়ি থানার তদন্তকারী অফিসার বিনয় যাদব তৎপরতার সঙ্গে মামলার সমস্ত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে। ১৭জন সাক্ষী দেয় আদালতে। সোমবার রায় ঘোষণা করেন জলপাইগুড়ি অতিরিক্ত জেলা এবং দায়রা আদালত চতুর্থ কোর্টের বিচারক। আদালতের সরকার পক্ষের আইনজীবী প্রণব বন্দ্যোপাধ্যায় জানিয়েছেন, সাক্ষী এবং সমস্ত তথ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে ঘটনাটিকে বিরলতম আখ্যা দিয়ে অভিযুক্তকে সর্বোচ্চ মৃত্যুদণ্ড এর সাজা দিয়েছেন বিচারক। পাশাপাশি আদালতের নির্দেশ, মৃত ব্যক্তির দুই নাবালক ছেলের ভরণপোষণের জন্য ছয় লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ হিসেবে দেওয়া হবে ডিস্ট্রিক্ট লিগ্যাল সেলের মাধ্যমে।
সাজা ঘোষণার পর কান্নার জল চেপে রাখতে পারেননি মৃতের স্ত্রী মৌমিতা দাস। তিনি এবং মৃতের আত্মীয়রা জানিয়েছেন, তাদের প্রিয়জন আর ফিরে আসবে না। তবে আদালতের রায়ে তারা খুশি। অন্য আরও পাচ অভিযুক্তেরও একই সাজা দাবি করেছেন তারা।

