বালুরঘাট, ১৪ সেপ্টেম্বর––একদিন ব্রিটিশের বিরুদ্ধে লড়তে কাঁধে কাঁধ মিলিয়েছিল বালুরঘাট। আর ৮৪ বছর পর সেই বালুরঘাট দিবস পালন ঘিরেই দেখা গেল বিভাজনের ছবি! ঐতিহাসিক ১৪ সেপ্টেম্বরকে স্মরণ করতে সোমবার সকালে জেলা প্রশাসনের ভবন চত্বরে বসল দুই পৃথক আয়োজন। এক দিকে বালুরঘাট দিবস উদযাপন কমিটির অনুষ্ঠান। সেখানে নেই প্রশাসনের আধিকারিকেরা, নেই বিধায়ক কিংবা শাসকদলের নেতৃত্ব। অন্য দিকে প্রশাসনের উপস্থিতিতে শহীদ বেদিতে মাল্যদান করলেন বিজেপি বিধায়ক ও নেতৃত্ব। একই ইতিহাস, অথচ উদ্যাপনে দুই ছবি। ঘটনায় বিস্মিত শহরবাসী। প্রশ্ন উঠেছে, রাজনৈতিক বিভাজনের ছায়া কি এ বার ইতিহাসের পাতাতেও?
সালটা ১৯৪২। দেশ জুড়ে ভারত ছাড়ো আন্দোলনের উত্তাল সময়। ১৪ সেপ্টেম্বর সেই আন্দোলনের ঢেউ আছড়ে পড়ে বালুরঘাটে। ডাঙ্গি এলাকা থেকে মিছিল করে স্বাধীনতা সংগ্রামী ও সাধারণ মানুষ পৌঁছে যান ট্রেজারি অফিসে। ব্রিটিশ প্রশাসনের প্রতীক ইউনিয়ন জ্যাক নামিয়ে সেখানে উত্তোলন করা হয় জাতীয় পতাকা। ট্রেজারি-সহ একাধিক সরকারি দফতরের নিয়ন্ত্রণও চলে যায় আন্দোলনকারীদের হাতে। প্রায় তিন দিন ব্রিটিশ শাসনমুক্ত ছিল বালুরঘাট।
সরোজ রঞ্জন চ্যাটার্জী, পুলিনবিহারী দাশগুপ্ত-সহ স্বাধীনতা সংগ্রামীদের নেতৃত্বে সংঘটিত সেই আন্দোলন আজও জেলার গর্ব। আয়োজকদের দাবি, স্বাধীনতার আগে কোনও অঞ্চলকে সাময়িক ভাবে ব্রিটিশ শাসনমুক্ত করার ঘটনায় দেশের মধ্যে বালুরঘাটের স্থান পঞ্চম।
সেই গৌরবের ইতিহাস স্মরণেই এ দিন বালুরঘাট দিবস উদ্যাপন কমিটির অনুষ্ঠান। যেখানে উপস্থিত ছিলেন স্বাধীনতা সংগ্রামী সরোজ রঞ্জন চ্যাটার্জীর নাতি আইনজীবী সুশোভন চ্যাটার্জী, আইনজীবী সুভাষ চাকি, পুরসভার ভাইস চেয়ারম্যান মুনমুন কর-সহ একাধিক কাউন্সিলর। আয়োজকদের স্পষ্ট বক্তব্য, এই অনুষ্ঠানে কোনও রাজনৈতিক রং নেই। ইতিহাসের সামনে দল-মত নির্বিশেষে সকলেই সমান।
কমিটির সাধারণ সম্পাদক সুভাষ চাকি বলেন, এখানে কোনও রাজনৈতিক দলের ব্যাপার নেই। জেলাশাসক শারীরিক অসুস্থতার কারণে আসতে পারেননি। বিধায়কও ব্যস্ততার কারণে আসতে পারেননি বলে জানিয়েছেন।
তবে পরে প্রশাসনের উপস্থিতিতে শহীদ বেদিতে মাল্যদান করতে দেখা যায় বিধায়ক বিদ্যুৎ রায়-সহ বিজেপি নেতৃত্বকে। বিজেপির জেলা সভাপতি স্বরূপ চৌধুরী বলেন, আমরা নির্দিষ্ট সময়ে গিয়ে শহীদ বেদিতে মাল্যদান করেছি। তখন প্রশাসনের লোকজনও উপস্থিত ছিলেন।
ফলে দিনের শেষে প্রশ্নটা থেকেই যায়—ব্রিটিশের বিরুদ্ধে যে বালুরঘাট এক হয়েছিল ১৪ সেপ্টেম্বর, স্বাধীনতার সেই স্মৃতিকে সামনে রেখে আজ কেন এত বিভাজন? ইতিহাসের পাতায় যাঁরা একসঙ্গে লড়েছিলেন, তাঁদের উত্তরসূরিরা কি অন্তত একটি দিনে একসঙ্গে দাঁড়াতে পারেন না?

