গঙ্গারামপুর দক্ষিণ দিনাজপুর;— দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার গঙ্গারামপুর এক সময় ছিল তাঁত শিল্পের জন্য সুপরিচিত একটি শহর।সূক্ষ্ম নকশা, পাকা রং এবং দক্ষ কারিগরদের চিত্তরঞ্জনের নিপুণ হাতে তৈরি শাড়ির জন্য এই অঞ্চলের বিশেষ সুনাম ছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই ঐতিহ্য আজ প্রায় বিলুপ্তির পথে।কোনো রকমে টিমটিম করে চলা তাঁত শিল্প এখন কার্যত ধ্বংসের মুখে দাঁড়িয়ে, আর জীবিকার তাগিদে বহু তাঁতি আজ বাধ্য হয়ে দিনমজুর জুটমিলের কর্মচারী থেকে টোটো চালানোর মতো পেশায় যুক্ত হচ্ছেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সাতের দশকে ওপার বাংলা থেকে আসা উদ্বাস্তু মানুষজন অবিভক্ত পশ্চিম দিনাজপুর জেলায় এই তাঁত শিল্প গড়ে তোলেন।পরবর্তীতে জেলা ভাগ হয়ে দক্ষিণ দিনাজপুর তৈরি হলে গঙ্গারামপুরে এই শিল্প আরও প্রসার লাভ করে।গঙ্গারামপুর ব্লকের ঠেঙ্গাপাড়া বোয়ালদহ মহারাজপুর সহ বিভিন্ন এলাকার পাশাপাশি ও পুরসভা ১২নম্বর ওয়ার্ড বসাকপাড়া, সাহাপাড়া ফুটবল হালদারপাড়া মিলিয়েই প্রায় ১০হাজার পরিবারের ৪০হাজারের বেশি মানুষজন সেই পেশার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। নব্বইয়ের দশকে এই শিল্পের স্বর্ণযুগ বলা চলে—প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই ছিল তাঁতের শব্দ, তৈরি হত বিভিন্ন ধরনের শাড়ি। রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত যেমন কলকাতা, রানাঘাট, ফুলিয়া, সমুদ্রগড় ও নবদ্বীপ থেকে পাইকাররা নিয়মিত আসতেন।তাঁতিরা ‘রোকার’ পদ্ধতিতে অর্ডার পেতেন এবং সেই অনুযায়ী শাড়ি তৈরি করে সরবরাহ করতেন।এই পেশার সঙ্গে যুক্ত থাকা মানুষজনদের কথা চিন্তাভাবনা করে রাজ্যে সরকারের অধীনে শহরের বুকে তাত কাপুড়ের হাট, ন্যায্য মূল্যে রং ও সুতো কেনার দোকান তৈরি করে দিয়েছিল।সেই মাকেট থেকে গঙ্গারামপুর শহরের তাতের তৈরি কাপুড় কিনতে আসতেন সকলেই।দাম ও ছিল ২০০/৩০০ টাকার মধ্যে সুন্দর সুন্দর শাড়ি পাওয়া যেত।কিন্তু বর্তমানে সেই সব দৃশ্য এখন অতীত। আধুনিক যন্ত্রনির্ভর উৎপাদনের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে ক্রমশ পিছিয়ে পড়েছে গঙ্গারামপুরের ঐতিহ্যবাহী তাঁত শিল্প। মেশিনে তৈরি সস্তা ও দ্রুত উৎপাদিত শাড়ির বাজার দখলের ফলে হাতে তৈরি শাড়ির চাহিদা কমেছে উল্লেখযোগ্যভাবে। ফলে আয় কমে যাওয়ায় একে একে তাঁত বন্ধ করে দিতে বাধ্য হচ্ছেন শিল্পীরা। ধ্বংস হয়েছে বামেদের সরকারের সময় তৈরি একাধিক সরকারি তাদের প্রকল্পও।এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে রং ও সুতোর অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি। তাঁতিরা জানাচ্ছেন, কাঁচামালের দাম এতটাই বেড়েছে যে, উৎপাদন খরচ তুলতে পারছেন না তারা। ফলে হাতে গোনা কয়েকটি তাঁত এখনো কোনোভাবে চালু থাকলেও সেগুলিও বন্ধ হওয়ার মুখে। গঙ্গারামপুরের তাঁতিরা আক্ষেপের সুরে জানান, সরকার যদি রং ও সুতোর উপর ভর্তুকি না দেয়, তবে এই শিল্প পুরোপুরি শেষ হয়ে গেছে।কেউ পাশে দাঁড়ালো না।”
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হল, জীবিকা নির্বাহের জন্য অনেক তাঁতি এখন বিকল্প পেশায় চলে যাচ্ছেন। কেউ দিনমজুর, কেউ বা ছোট ব্যবসায়ী, আবার অনেকেই টোটো চালিয়ে সংসার চালাচ্ছেন। একসময় যারা দক্ষ শিল্পী হিসেবে পরিচিত ছিলেন, আজ তারা বাধ্য হয়ে অন্য পেশায় যুক্ত হচ্ছেন—এ এক বড় সামাজিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। ভাঙাচোরা দামে তা তারা সরঞ্জাম বিক্রি করে অনেকে ভিনদেশে পাড়ি দিয়েছে। আক্ষেপ শুধু একটাই কবে ফিরবে তাদের এই সুদিন।
এদিকে আসন্ন ভোটকে সামনে রেখে ক্ষোভ ক্রমশ বাড়ছে সাধারণ মানুষের মধ্যে। স্থানীয়দের অভিযোগ, কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ থেকে তাঁত শিল্প রক্ষায় কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। নানা প্রকল্পের কথা শোনা গেলেও বাস্তবে তার কোনো সুফল মেলেনি বলেই দাবি তাঁদের। ফলে শিল্পীদের মধ্যে হতাশা এবং ক্ষোভ চরমে পৌঁছেছে।
তাঁতিদের দাবি, অবিলম্বে কাঁচামালের উপর ভর্তুকি, সহজ শর্তে ঋণ এবং বাজারে সরাসরি বিক্রির সুযোগ করে দিতে হবে। পাশাপাশি, আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে প্রশিক্ষণ এবং সরকারি বিপণন ব্যবস্থার উন্নয়নও জরুরি। না হলে গঙ্গারামপুরের এই ঐতিহ্যবাহী শিল্প সম্পূর্ণভাবে হারিয়ে যাবে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাত সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত রামগোপাল বিশ্বাস উৎপল গোস্বামীরা বলেন,”কেন্দ্রীয় সরকারি আমাদের শেষ করল। রাজ্য সরকার বর্তমানে তন্তুজের মাধ্যমে কিছুটা হলেও তাঁতিদের বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করছে।” গঙ্গারামপুরের বিজেপির বিধায়ক তথা বর্তমানে বিজেপি প্রার্থী সত্যেন্দ্রনাথ রায় অবশ্য,”তাঁত শিল্পীদের জন্য অনেক কিছু করেছেন বলে দাবি করেছেন।আবার ভোটে জিতলে তিনি তাফীদের বিষয়টি কেন্দ্রীয় সরকারের নজরে সমস্যা সমাধান করবেন বলে আশ্বাস দেন।” যদিও গঙ্গারামপুরে তৃণমূল প্রার্থী গৌতম দাস বলেন,”আমাদের সরকারি তাঁত শিল্পীদের জন্য যথেষ্ট পরিমাণে উন্নতি করার চেষ্টা করেছিল তার সুফল আজ গঙ্গারামপুরে দাঁড়িয়ে। কেন্দ্রীয় সরকারের জন্যই আজ এমন পরিস্থিতি তৈরি হলো তাঁত শিল্পীদের। বিষয় ইস্যু করে প্রচারও করা হচ্ছে কেন্দ্র সরকারের ব্যর্থতা তুলে ধরে।” সিপিআইএম প্রার্থী বিপ্লব বর্মন বলেন,”বাম সরকারের সময়েই প্রয়াত মন্ত্রী নারায়ণ বিশ্বাস বহু কিছু করেছিলেন। বর্তমান দুই সরকারি এই শিল্পীটাকে দিয়ে ভাবি নি বলেই আজ তাদের এই দশা। আমরা ক্ষমতায় এলেই শিল্পকে বাঁচিয়ে তোলা হবে বলে তিনি আশ্বাস দেন।”
সব মিলিয়ে, এক সময়ের গর্বের তাঁত শিল্প আজ অস্তিত্বের সংকটে। শিল্প বাঁচাতে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে, ভবিষ্যৎ প্রজন্ম হয়তো শুধু ইতিহাসের পাতায়ই খুঁজে পাবে গঙ্গারামপুরের তাঁতের গল্প। আর সেই সঙ্গে হারিয়ে যাবে বহু মানুষের জীবিকা ও সংস্কৃতির এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়

